গণিতের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস

 




অনেকগুলো মৌলিক শাখার সমন্বয়ে গণিতশাস্ত্র আজ সমৃদ্ধ। তাই গণিতশাস্ত্রের কোন একক জনক নেই। যেমন- পাটিগণিতের জনক ভারতীয় গণিতবিদ আর্যভট্ট। জ্যামিতির জনক ইউক্লিড ইত্যাদি। প্রায় পাঁচ হাজার বছর পূর্বে পাথরের গায়ে দাগ কাটা বা টালি কাটা দিয়ে গণিতশাস্ত্রের অগ্রযাত্রা শুরু হয়। যদিও সংখ্যামালার আবিষ্কারকে গণিতশাস্ত্রের আদি ইতিহাস ধরা হয়। প্রাচীন মিশরীয় সভ্যতা ও প্রাচীন গ্রীক সভ্যতাকেই মৌলিক গণিতশাস্ত্রের আদিভূমি ধরা হয়। তবে ১৬৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দে আহমেসকেই প্রথম প্রমাণিক গণিতবিদ মনে করা হয়। তিনি গণিতের পরিমাপ পদ্ধতির উদ্ভাবন করেন। অতঃপর গ্রীক গণিতবিদ থ্যালিসের (৬৩০ খ্রীঃ পূঃ-৫৫০ খ্রীঃ পূঃ) নাম উল্লেখযোগ্য। তিনি পরিমাপ পদ্ধতিকে শক্তিশালী করেন। এরপর আসে জ্যামিতির আদি কিংবদন্তী গণিতবিদ পিথাগোরাস (৫৭০ খ্রীঃ পূঃ-৪৯০ খ্রীঃ পূঃ) এর নাম। সমকোণী ত্রিভুজের সূত্রাবলী তার শ্রেষ্ঠ অবদান। জ্যামিতির জনক গ্রীক গণিতবিদ ইউক্লিড (৩২৫ খ্রীঃ পূঃ-২৬৫ খ্রীঃ পূঃ) ১৩ খন্ডের দি এলিমেন্টস লিখে জ্যামিতিকে চিরস্থায়ী করেছেন। ডায়োফ্যান্টাস (২৯৫ খ্রীঃ পূঃ) কর্তৃক সর্বপ্রথম দ্বিঘাত সমীকরণের সমাধান আবিস্কৃত হয়। আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল-খেয়ারেজমী ‘আল জাবর ওয়াল মুকাবেলা’ নামক বই লিখে বীজগণিতের আধুনিক ভিত্তি রচনা করেন। তাঁর গ্রন্থের নাম থেকেই এ্যালজ্যাবরা কথাটি এসেছে। স্বতন্ত্রভাবে নিউটন ও লিবনিজ কর্তৃক ক্যালকুলাস আবিস্কৃত হয় ১৬৮০ থেকে ১৭১০ সালের মধ্যে। ক্যালকুলাস আবিস্কার দ্বারা গণিতশাস্ত্র চরমভাবে সমৃদ্ধ হয়। খুলে যায় প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিদ্যার অসীম দুয়ার। গণিতশাস্ত্র বীজগণিত ও জ্যামিতির পর ক্যালকুলাস সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে। ক্যালকুলাসের পাশাপাশি ওমর খৈয়ম ও আল বেরুনীর ত্রিকোণমিতি, রেনেট ডেসকার্তের স্থানাংক জ্যামিতি, লভোকভের বিশ্লেষিত জ্যামিতি গণিতশাস্ত্রকে পরিপূর্ণরূপ দান করে। গত শতাব্দির লিনিয়ার প্রোগ্রামিং, প্রজেক্ট গণিত, নির্মাণ গণিত উদ্ভাবিত হয়ে গণিতকে বিজ্ঞানের সর্বাধিক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। আজকাল কম্পিউটার প্রযুক্তিতে প্রকল্পিত গণিতের ব্যাপক ব্যবহার পরিলক্ষিত হচ্ছে। 

 

সর্বকালের শ্রেষ্ঠ তিন গণিতবিদ ঃ 

পৃথিবীর সকল গণিত-ইতিহাস গ্রন্থ, সকল গণিত-ডিকশনারি, সকল গণিত-ইন্টারনেট ফাইল রচয়িতাগণ একমত যে, সর্বকালের শ্রেষ্ঠ তিন গণিতবিদ হলেন আর্কিমিডিস, নিউটন ও গ্রাউস। এদের মধ্যে আর্কিমিডিস পদার্থ, পাটিগণিত ও জ্যামিতির জন্য বিখ্যাত, নিউটন বলবিদ্যা ও ক্যালকুলাসের জন্য বিখ্যাত এবং গাউস সংখ্যাতত্ত্ব ও পরিসংখ্যানের নরমাল ডিসট্রিবিউশনের জন্য বিখ্যাত। 


আবু জাফর মুহাম্মদ ইবনে মুসা আল খেয়ারিজমী (৭৮০-৮৫০)ঃ

তিনি ৭৮০ সালে রাশিয়ার জন্মগ্রহণ করেন এবং ৮৫০ সালে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ গ্রন্থ আল জাফর ওয়াল মুকাবেলা নামকরণ থেকেই এ্যালজ্যাবরা শব্দটির জন্ম। এটি সমীকরণ ভিত্তিক এ্যালজ্যাবরার উপর প্রথম বিজ্ঞানসম্মত বই। তাই তাঁকে বীজগণিত ও সমীকরণ তত্ত্বের জনক বলা হয়। 


ইউক্লিড (৩২৫ খ্রীঃ পূঃ-২৬৫ খ্রীঃপূঃ) ঃ 

তিনি খ্রীষ্টপূর্ব ৩২৫ সালে গ্রীসে জন্মগ্রহণ করেন এবং খ্রীষ্টপূর্ব ২৬৫ সালে গ্রীসের আলেকজান্দ্রিয়া শহরে মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর অমর গ্রন্থ দি এলিমেন্টস হলো উইক্লিডিয়ান জিওম্যাট্রির মুলভিত্তি। এজন্য তাঁকে জ্যামিতির জনক বলা হয়। 


স্যার আইজাক নিউটন (১৬৪৩ খ্রীঃ-১৭২৭ খ্রীঃ) ঃ 

তিনি ১৬৪৩ সালের ৪ জানুয়ারি ইংল্যান্ডের ল্যাংকশায়ার শহরের উলসথ্রোপ গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭২৭ সালের ৩১ মার্চ লন্ডনে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি চিরায়ত বলবিদ্যার গতিসূত্র ও ক্যালকুলাস আবিস্কার করে চিরস্মরণীয় হয়ে আছেন। অবশ্য তাঁর সময়েই গটফ্রিড উইলহেম লিবনিজ নামক অপর একজন গণিতবিদ স্বতন্ত্রভাবে ক্যালকুলাস আবিস্কার করেন। তথাপি নিউটনকেই ক্যালকুলাসের (বিশেষত ডিফারেন্সিয়াল ক্যালকুলাসের) জনক বলা হয়। 


গটফ্রেইড উইলহেম লিবনিজ (১৬৪৬-১৭১৬) ঃ 

তিনি ১৬৪৬ সালের ২১ জুন জার্মানির লিপজিগ শহরে জন্মগ্রহণ করেন এবং ১৭১৬ সালের ১৪ নভেম্বর মৃত্যুবরণ করেন। তিনি নিউটনের সময়েই স্বতন্ত্রভাবে ক্যালকুলাস আবিষ্কার করেন। কিন্তু তিনি অসাধারণ উদার মনের পরিচয় দিয়ে নিউটনকে এক চিঠির মাধ্যমে ক্যালকুলাস আবিষ্কারের একক স্বত্ব নিউটনকেই প্রদান করেন। তথাপি আমরা লিবনিজকে ক্যালকুলাসের (বিশেষত ইন্টিগ্রাল ক্যালকুলাসের) সহজনক হিসেবে স্মরণ করি। 


Comments